Updated on November 22nd, 2020 at 9:05 am(BST)

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত কেন ঢাকার পাশে নেই

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে বিপুল ভোটে চতুর্থবারের মতো রেজুলেশন গৃহীত হয়েছে। মিয়ানমারের মানবাধিকার লংঘন আর সহিংসতার শিকার নির্যাতিত মানুষের প্রতি জাতিসংঘের বিপুল সংখ্যক সদস্য অকুণ্ঠ সমর্থন জুগিয়েছে এ প্রস্তাবে।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, রেজুলেশনটিতে মিয়ানমারকে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। বিষয়গুলো হলো – রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানসহ সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করা, প্রত্যাবর্তনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

রেজুলেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও আশ্রয়দানের ক্ষেত্রে যে অনুকরণীয় মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে ভূয়সী প্রশংসা করা হয়।

এই রেজুলেশন বাংলাদেশসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে গঠনমূলক প্রক্রিয়া যুক্ত হয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারকে নতুনভাবে চাপ সৃষ্টি করবে আশা করা যাচ্ছে। রেজুলেশনের পক্ষে ভোট দেয় ১৩২টি দেশ। আঞ্চলিক ভূখণ্ডের বাইরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা মেক্সিকো আর্জেন্টিনা নিউজিল্যান্ড সুইজারল্যান্ডসহ সমর্থন পায় প্রস্তাবটি। সমর্থন পায়নি রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ, ‘‘রাখি বন্ধনে’ সংযুক্ত, ‘আকাশচুম্বী’ সম্পর্কের উচ্চতায় সম্পর্কিত ভারতের। ভারত ভোটদান থেকে বিরত থেকেছে।

কারণ এই প্রস্তাবে অংশগ্রহণ করার মত কোন প্রয়োজন ভারত উপলব্ধি করেনি। এক মিলিয়নের মতো বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশের অবস্থান করছে, এতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা হুমকি সৃষ্টি করতে পারে এটা জেনেও ভারত চরম সংকট এবং দুর্দিনেও বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে মিয়ানমার কর্তৃক হুমকি সৃষ্টি হতে পারে এমন ইস্যুতে ভারতকে বাংলাদেশ পাশে পায়নি। মিয়ানমার প্রায়শই বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে সেনাশক্তি মোতায়েনসহ বাংলাদেশের আকাশসীমায় সামরিক হেলিকপ্টার দিয়ে মহড়া প্রদর্শন করে। সেই মিয়ানমারকে ভারত সাবমেরিনসহ সামরিক সরঞ্জাম উপঢৌকন দিচ্ছে। এটাই হচ্ছে কথিত ‘আকাশচুম্বী বন্ধুত্বের’ ‘দৃশ্যমান’ নমুনা।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর পৈশাচিক বীভৎসতা এবং জঘন্য পাপাচারের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ভারত ও চীন নৈতিক সমর্থন জানিয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত-চীন চিরবৈরী দুই দেশের ঐক্য বা সমঝোতার জায়গাটুকু চিহ্নিত করা বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্নেই খুবই জরুরি।

জাতিসংঘের প্রস্তাবে ভারতের ‘নীরবতা’ এবং চীনের ‘বিরোধিতা’ সংকটের সমাধানকে আরো প্রলম্বিত করবে, আন্তর্জাতিক সমঝোতার মাঝে বিভক্তিমূলক দেয়াল তুলবে এবং রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণভাবে দ্বন্দ্ব-সংঘাতপ্রবণ হয়ে পড়বে। এসব বিষয়ে আমাদের গভীর বিশ্লেষণ দরকার।

আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক, ভূআঞ্চলিক রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব, কৌশলগত মিত্রতা এ সবকিছু নির্ভর করে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতার প্রশ্নে মর্যাদাপূর্ণ সমঝোতার ওপর।

রোহিঙ্গা সংকটে যখন আন্তর্জাতিক মতৈক্য এবং সমর্থন বাংলাদেশের জন্য খুবই জরুরি প্রয়োজন তখন ভারত যদি বাংলাদেশ প্রতি ‘প্রত্যাখ্যানের বাণ’’ নিক্ষেপ করে সেটা মোটেই ‘সুসম্পর্কে’র পরিচায়ক নয়। ভারতের এ আচরণ এ অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ইতিবাচক সমাধানের রাস্তা রুদ্ধ করে দিচ্ছে কিনা,ভারতের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মতাদর্শিক ক্ষেত্রে অবিরাম সমর্থনের সম্ভাবনা ক্ষুন্ন হয়েছে কিনা তা আমাদের তলিয়ে দেখা দরকার।

প্রতিদিন যারা ভারতের সম্পর্কের গভীরতা বিশেষণে ভূষিত করতে মাতামাতি করছেন, সম্পর্কের উচ্চতা প্রমাণ করতে ‘ক্ষুরধার তৎপরতা’ চালাচ্ছেন তারা এখন ভারত এবং চীনের ভূমিকা ‘দুঃখজনক’ বলার তাগিদটুকু পাচ্ছেন না। এটা জাতীয় স্বার্থের পরিচায়ক নয়।

ইরাক যুদ্ধের কারণে মিলিয়ন মিলিয়ন উদ্বাস্তুদের জায়গা দিয়েছিল সিরিয়া। এখন সিরিয়া পরাশক্তির রণক্ষেত্র, পরাশক্তির পাপ বইতে বইতে সিরিয়া এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত। সিরিয়া নামক রাষ্ট্রের কোন অগ্রাধিকার কোন পরাশক্তির কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে না। সবাই মিলে তাকে রসাতলে নিয়ে গেছে। দেশটা প্রতিনিয়ত শোচনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।

আমরাও এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের অনেকের অভিনন্দন পেয়েছি। কিন্তু সমাধান যত দূরবর্তী হবে আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ততবেশি সংকটগ্রস্ত হবে। আঞ্চলিক পরাশক্তির সমর্থন ছাড়া মিয়ানমারের মত রাষ্ট্রের পক্ষে এই ‘গণহত্যা’ সংঘটন ও নিজ দেশের নাগরিকদের ‘বাস্তুচ্যুত’ করে দেশ ছাড়া করার মতো নৃশংস পদক্ষেপ গ্রহণ কোনোক্রমে সম্ভব ছিলো না।

আমরা যে ভারতকে ‘রাখি বন্ধনের’ সম্পর্ক বলে আত্মতুষ্টি প্রকাশ করছি জাতিসংঘের প্রস্তাবে ভোট দেয়া থেকে বিরত থেকে ভারত কি বন্ধুত্বের সর্বোচ্চ ‘উত্তম লক্ষণ’ প্রকাশ করেছে? গণহত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের উত্থাপিত প্রস্তাবে ১৩২ টি দেশ সমর্থন দেওয়ার পরও ভারত যদি ভোট দানে বিরত থেকে, মিয়ানমারকেই নিরবচ্ছিন্ন নৈতিক সমর্থন জানায় তাতে কি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ‘সর্বোচ্চ উচ্চতা’ নিশ্চিত হয়? ঘনিষ্ঠ ও মিত্র রাষ্ট্রের এ ধরনের ভূমিকা অগ্রহণযোগ্য এবং ঝুঁকিবহুল।

আমরা নিকট অতীতে দেখেছি কি করে মিথ্যা পটভূমি তৈরি করে ইরাক আক্রমণ করা হয়েছে। ইরাক ধ্বংস করে এখন অনিচ্ছা সত্বেও স্বীকার করে সেখানে ‘গণবিধ্বংসী’ অস্ত্র ছিল না। এই স্বীকার-অস্বীকারের মধ্য দিয়ে একটি রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল, কিন্তু পরাশক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে অক্ষতই থেকে গেল।

আঞ্চলিক রাজনীতির ঘূর্ণিপাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যদি হুমকির সম্মুখীন হয় তখন কি আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রসমূহ আমাদের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হবে, না প্রতিপক্ষের সাথে শক্তি প্রয়োগ করার জোট গঠন করবে এসব বিষয় প্রতিমুহূর্তে বিবেচনায় রাখতে হবে।

প্রতিবেশীর সাথে অবশ্যই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু প্রতিবেশীও যে সাম্রাজ্য বিস্তারে আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে ইতিহাসের শিক্ষাও আমাদের মনে রাখতে হবে। বিশ্বের সীমান্তসংলগ্ন রাষ্ট্রগুলোর দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও প্রতিরোধ-প্রতিশোধের দীর্ঘ ইতিহাসও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।

Total views 48

মূল প্রকাশকের সংবাদটি পড়তে এই লিংকে ক্লিক করুন Click Here.  উপরের সংবাদ এবং ছবিটি থেকে সংগ্রহীত এবং এই সংবাদটির মূল প্রকাশক কর্তিক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই সংবাদটি কোন প্রকার সংশোধন পরিবর্তন অথবা পরিবর্ধন ছাড়া অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত। প্রকাশক কর্তিক যে কোনো আপত্তি webbangladeshgroup@ gmail.com গ্রহণ করা হয়। এই সংবাদে প্রকাশিত সংবাদ, তথ্য বা মতবাদ এর সাথে ওয়েব বাংলাদেশ এর কোন সম্পর্ক নাই এবং কোন প্রকার দায় ভার গ্রহণ করে না।